ঘরেই তৈরি করুন ব্যাম্বো চিকেন

Bamboo Chicken ব্যাম্বো চিকেন

ব্যাম্বো চিকেন (Bamboo Chicken) অর্থাৎ বাশেঁর চোঙার ভিতর রান্না করা মুরগীর মাংস, পাহাড়ে খুবই প্রিয় খাবার। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীদের বিশেষ তরকারি তালিকায় একটি হল বাঁশের ভিতর রান্না এই তরকারি। শুধু মুরগী নয় মাছ, শুটকিও রান্না হয় চোঙার ভিতরে। চাকমারা একে বলে “চুমো গোরাং”। মারমারা বলে “ক্যাংদং হাং। ত্রিপুরারা বলে “ওয়াসুং-গ প্রেংনাই”।

বাংলায় এর কোন নাম না থাকলেও তারা বলেন ব্যাম্বো চিকেন, আর মাছ হলে বলে ব্যাম্বো ফিশ।

পাহাড়ের মানুষদের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে চোখে পড়ে এই তরকারি। ১৫/২০ বছর আগে আদিবাসীরা বাঁশের চোঙা দিয়ে বেশী রান্না করতো। বর্তমানে দস্তা বা অ্যালুমিনিয়াম তৈরি বিভিন্ন ধরণের পাতিল বা পাত্র আসায় এর প্রচলন কমে গেছে। এখন বাঁশের চোঙার পরিবর্তে রান্নার কাজে দস্তার পাতিল ব্যবহার করা হয়। তবে বাঁশের ভিতরে রান্না সুস্বাদু এই খাবারের কথা কেউ ভুলেনি।

বাশেঁর চোঙার মধ্যে কিভাবে রান্না হয়? এর স্বাদ কেমন? যারা দেখেননি তাদের হয়ত খুব আগ্রহ হচ্ছে। তবে আদিবাসীদের পক্ষে এর উত্তর দেয়া খুব সহজ।

এই রান্নাটির জন্য প্রয়োজন বাঁশ। অপরিপক্ক তাজা এবং কাঁচা বাঁশ হলে ভাল হয়। এ বাঁশে পানির পরিমাণ বেশী থাকায় সহজে পুড়ে যায় না, ফলে দীর্ঘ সময় আগুনে রাখা যায়। সব বাঁশ দিয়ে রান্না করা গেলেও মূলত ফারোয়া বাঁশ, ডুলু বাঁশ, মিটিঙ্গ্যা বাঁশ বেশী ব্যবহার হয়। এগুলো আকারে অন্য বাঁশের চেয়ে বড়। একটি বাঁশ হতে ২০-৩০টির অধিক চোঙা পাওয়া যায়। চোঙাটির একদিকে মুখ রেখে একদিকে বাঁশের গিরা রাখা হয়।

চোঙার মধ্যে রান্না করা মাছ/ মাংসের টুকরো সাধারণত ছোট হয়। বাঁশের মধ্যে সহজে সিদ্ধ হওয়ার সুবিধার্থে টুকরোগুলো ছোট করা হয়। টুকরোগুলো ছোট হওয়ায় প্রতিটি টুকরোতে সহজে তেল মসলা প্রবেশ করতে পারে।

রান্নার জন্য মাছ/ মাংস একটি পাত্রে রেখে তার মধ্যে পরিমাণ মত তেল, পানি, লবণ, হলুদ, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ রান্নাটির সাথে সংশ্লিষ্ট মসলা ভালভাবে মাখানো হয়। কাঁচা বাশের চোঙার ভেতর মুরগীর মাংস রান্নার এই পদ্ধতিতে পানি কিংবা তেল কোনটাই ব্যবহার করা হয় না। চোঙার এক প্রান্ত খোলা থাকে, পরে কলা পাতা (অথবা ক্ষতিকর নয় এমন যেকোন কাঁচা পাতা) মুড়ে বাঁশের মুখ বন্ধ করে দিতে হয়। এবার বাঁশটা কয়লার আগুনে পুড়লেই ব্যাম্বো চিকেন তৈরি হয়ে যাবে। বাঁশটা যখন পুড়ে কাল হয়ে যাবে বুঝতে হবে বাঁশের ভেতরের মুরগী রান্না হয়ে গিয়েছে।

বাঁশের চোঙাটি যেন পুড়ে না যায় এবং চোঙাটি চারদিকে যেন সমানভাবে তাপ পায় সেজন্য কয়েক মিনিট পর পর চোঙাটি ঘুরিয়ে দিতে হয়। এভাবে চুলায় রাখার পর যখন চোঙাটি হতে বুদবুদ হয়ে বাষ্প বের হয় তখন এটি খাওয়ার জন্য উপযোগী হয়ে উঠে। ততক্ষণে বাঁশটা পুড়ে কাল হয়ে যাবে।কলাপাতা সরিয়ে মাছ/মাংসের টুকরোগুলো সিদ্ধ হয়েছে কিনা পরীক্ষা করে চুলা থেকে নামিয়ে নিতে হবে। এই বিশেষ রান্নার গন্ধটি সবাইকে আকৃষ্ট করবে। বাঁশের ভেতর থেকে রান্না করা মুরগী বের করে সবুজ পরিস্কার কলা পাতায় পরিবেশন করতে পারেন, এতে দেখতেও ভাল লাগবে।

রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে আসা পযর্টকদের প্রধান আকর্ষণ এই তরকারি। রাঙ্গামাটি বনরুপা শহরের রাজবাড়ি সাবারাং রেস্টুরেন্ট, বনরুপা শহরের রুচ্ছেদোলা হোটেল, হোটেল রুফ, সুবলং এলাকার জুমঘর রেস্টুরেন্টে এই তরকারি পাওয়া যায়। এর জন্য আগে অর্ডার দিলে ভাল হয়।
চাইলে স্থানীয় বাজার থেকে বাশেঁর চোঙা ঘরে নিয়ে রান্না করে খাওয়া যায়। প্রতিটি চোঙা ৫-১০ টাকা করে বিক্রি হয় বাজারে। বুধবার ও শনিবার রাঙ্গামাটি শহরের কলেজ গেটে সকালে এবং সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বনরুপা বাজারে বাঁশের চোঙা পাওয়া যায়।

শহর অঞ্চলে লাকড়ি চুলা ব্যবহার কমে যাওয়ায় বাঁশের ভিতর রান্না করা তরকারি খেতে সময় সুযোগ পেলে এখনও গ্রামে ছুটে যায় আদিবাসীরা।

উপাদানঃ

  • হাঁড় ছাড়া মুরগীর মাংস – ৫০০ গ্রাম
  • গরম মশলা – ১ টেবিল চামচ
  • লেবুর রস – ১ টা লেবু
  • ধনে গুঁড়া – ৩ টেবিল চামচ
  • মরিচের গুঁড়া – ১ টেবিল চামচ
  • আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
  • লবন – স্বাদমতো
  • হলুদ গুঁড়া – আধা (১/২) টেবিল চামচ
  • ধনে পাতা কুচি
  • কাঁচা মরিচ – ১ টা
  • অলিভ ওয়েল – ১ টেবিল চামচ
  • কাঁচা বাঁশের চোঙা – ১ গিরা, এক পাশ খোলা (২০ সে.মি. প্রায়)
  • কলা পাতা

প্রস্তুত প্রণালীঃ

মুরগীর মাংসের টুকরাগুলো একটা পাত্রে নিন। এর উপর হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া এবং লবন ছড়িয়ে দিন। ধনে গুঁড়া, গরম মশলা, আদা-রসুন বাটা এবং লেবুর রস ছড়িয়ে দিন। ১ টেবিল চামচ অলিভ ওয়েল দিন। মাংসের সাথে ভাল করে মাখান। ২০ মিনিট ঢেকে রেখে মেরিনেট করুন।

এবার বাঁশের চোঙাতে মেরিনেট করা মাংসের টুকরাগুলো ভরে নিন। বাঁশটা ঝাকি দিন, মাংসের টুকরাগুলো চেপে বসবে, বাঁশের ভেতরে ফাঁকা থাকবে না। মাংসের টুকরা দিয়ে বাঁশটা ভরে গেলে, কলা পাতা মুড়ে বাঁশের মুখটা আটকে দিন। আরেকটা টুকরা কলা পাতা পেঁচিয়ে তার দিয়ে বেঁধে দিন বাঁশের খোলা মুখটা।

মাংস ভর্তি বাঁশটি কয়লার আগুনে পুড়ে নিন। লাকড়ি জ্বালিয়ে তাতেও পুড়ে নিতে পারেন। ৩০ মিনিট (বা তার বেশি সময়) ধরে আগুনে পুড়তে হবে। এর মধ্যে ১৫ মিনিট বেশি আগুনে আর ১৫ মিনিট কম আগুনে। বাঁশটা উলটে-পালটে দিবেন যাতে সবদিক ভালভাবে রান্না হয়। বাঁশের বাহিরের দিক যখন পুড়ে কাল হয়ে যাবে বুঝতে হবে বাঁশের ভেতরের মাংস রান্না হয়ে গিয়েছে।

আগুন থেকে বাঁশটা তুলে তার উপর পানি ঢেলে দিন, এতে ছাই ছড়াবে না। বাঁশের চোঙার মুখ থেকে কলা পাতা সরিয়ে ভেতরের মুরগীর মাংস বের করে নিন। বাটিতে বা কলাপাতায় ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন। ভাল লাগলে কিউব করে কাটা পেঁয়াজের সাথেও পরিবেশন করা যেতে পারে।

দেখে নিন মাংস ভর্তি বাঁশটি পোড়ানোর বিভিন্ন উপায়

Bamboo Chicken ব্যাম্বো চিকেন

ছবিঃ মাংস ভর্তি বাঁশ পোড়ানোর নানা উপায়

Bamboo Chicken ব্যাম্বো চিকেন

ছবিঃ মাংস ভর্তি বাঁশ পোড়ানোর নানা উপায়

Bamboo Chicken ব্যাম্বো চিকেন

ছবিঃ মাংস ভর্তি বাঁশ পোড়ানোর নানা উপায়

Bamboo Chicken ব্যাম্বো চিকেন

ছবিঃ মাংস ভর্তি বাঁশ পোড়ানোর নানা উপায়

কাঁচা বাঁশের চোঙা না পেলে কি করবেন?

শহরাঞ্চলে কাঁচা বাঁশের চোঙা না পেলে শুধু কলা পাতায় মুড়েও (ছবিতে দেখুন) আপনি ব্যাম্বো চিকেনের স্বাদ পেতে পারেন। কয়েক লেয়ার করে কলা পাতায় পেঁচিয়ে মেরিনেট করা চিকেনগুলো ৪৫ মিনিটের মত ঢাকনা দেয়া পাতিলে রান্না করতে হবে। এসময় চুলার আগুল খুব বেশি দেয়া যাবে না।

Bamboo Chicken ব্যাম্বো চিকেন

ইউটিউবের এই ভিডিওতে হাতে কলমে ব্যাম্বো চিকেন রান্নাটি দেখে নিতে পারেন –

* এই রেসিপিটি তৈরিতে আমাকে সাহায্য করেছেন আমার ছেলে শাহজাহান সিরাজ, ভূলু’স রেসিপি ব্লগের একজন অতিথি লেখক। 

happy wheels

About ভূলু | ভূলু'স রেসিপি

আমি ‘ফজলুর নূর ভূলু’। আমার রান্নাঘরের অরিজিনাল সব রেসিপি নিয়েই আমার এই ব্লগ – “ভূলু’স রেসিপি”। এই রেসিপি ব্লগের মাধ্যমে আমি দেশি খাবার আর তার অতুলনীয় স্বাদের বৈচিত্র তুলে ধরতে চাই। সাথে আমাদের আঞ্চলিক এবং ঐতিহ্যবাহী রান্নাগুলোও থাকবে। ভবিষ্যতে এইসব রেসিপি আর ব্লগের গল্পগাঁথা নিয়ে একটি বই প্রকাশের ইচ্ছে আছে।